বাংলাদেশের আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আর নেই | বিএসএস

PHOTO: BSS
Share the News

বাংলাদেশে গণতন্ত্রের আপসহীন নেত্রী হিসেবে পরিচিত বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া আজ সকালে ইন্তেকাল করেছেন। রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।

আজ সকালে হাসপাতালের সামনে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন,
“আমাদের প্রিয় দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আজ ভোর আনুমানিক সকাল ৬টার দিকে ফজরের নামাজের পর ইন্তেকাল করেছেন।”

তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে হৃদ্‌রোগ ও ফুসফুসের সমস্যা, লিভার ও কিডনি জটিলতা, ডায়াবেটিস, বাত, চোখের নানা রোগসহ একাধিক শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন। তার শরীরে স্থায়ী পেসমেকার বসানো ছিল এবং আগে হৃদ্‌যন্ত্রে স্টেন্টও করা হয়েছিল।

হৃদ্‌যন্ত্র ও ফুসফুসে সংক্রমণ ধরা পড়ায় চিকিৎসকদের পরামর্শে গত ২৩ নভেম্বর তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তিনি নিউমোনিয়াতেও ভুগছিলেন।

লন্ডনে উন্নত চিকিৎসা শেষে গত ৬ মে দেশে ফেরার পর থেকেই তিনি নিয়মিত এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাচ্ছিলেন।

বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়া ১৯৯১ সালে গণতন্ত্রের যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক উত্তরাধিকার রেখে গেছেন। ওই বছরের জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি সরকারপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার নেতৃত্বেই দেশে সংসদীয় শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তিত হয় এবং অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়।

২০১৮ সাল থেকে কারাবন্দি থাকা সত্ত্বেও উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশে পাঠানোর আবেদন তার দল ও পরিবার একাধিকবার জানিয়েছিল, তবে সে সময়কার ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করে।

তিনি রেখে গেছেন তার বড় ছেলে তারেক রহমানসহ অসংখ্য আত্মীয়স্বজন ও গুণগ্রাহী। ১৭ বছর নির্বাসনে থাকার পর তারেক রহমান গত ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন। খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো কয়েক বছর আগে মালয়েশিয়ায় মারা যান।

খালেদা জিয়া ১৯৪৫ সালে দিনাজপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি প্রথমে দিনাজপুর মিশনারি স্কুলে পড়াশোনা করেন এবং ১৯৬০ সালে দিনাজপুর গার্লস স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন।

তার পিতা ইস্কান্দার মজুমদার ছিলেন একজন ব্যবসায়ী এবং মাতা তাইয়েবা মজুমদার ছিলেন গৃহিণী। ‘পুতুল’ ডাকনামে পরিচিত খালেদা ছিলেন তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে দ্বিতীয়।

১৯৬০ সালে তিনি তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানকে বিয়ে করেন এবং ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত দিনাজপুরের সুরেন্দ্রনাথ কলেজে পড়াশোনা চালিয়ে যান।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে জিয়াউর রহমান বিদ্রোহ করে যুদ্ধে অংশ নেন।

১৯৮১ সালের ৩০ মে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর বিএনপি গভীর সংকটে পড়ে। সে সময় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত না থাকা সত্ত্বেও খালেদা জিয়া ১৯৮৪ সালের ১২ জানুয়ারি বিএনপিতে যোগ দিয়ে ভাইস-প্রেসিডেন্ট হন। একই বছরের ১০ মে তিনি দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। পরে ২০১০ সালের জানুয়ারিতে তিনি পুনরায় বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।

খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ১৯৮৩ সালে বিএনপি সাতদলীয় জোট গঠন করে এবং স্বৈরশাসক এরশাদবিরোধী আন্দোলন শুরু করে।

এরশাদ সরকার তার চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করে এবং একাধিকবার তাকে আটক করে। তবে সব বাধা উপেক্ষা করে তিনি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন এবং তখন থেকেই তিনি ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনে বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। খালেদা জিয়া পরপর তিনটি সংসদ নির্বাচনে পাঁচটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সবকটিতেই জয়ী হন।

১৯৯১ সালের ২০ মার্চ তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। নতুন সংসদীয় ব্যবস্থার অধীনে ১৯ সেপ্টেম্বর ১৯৯১ তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পুনরায় শপথ গ্রহণ করেন।